প্রতিরাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেনঃ
আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ্ তা’আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছ এমন যে, আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছ এমনে, আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৯/তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত, হাদিস নম্বরঃ ১০৭৯]
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাদের বরকতময় ও মহান প্রতিপালক প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকার সময় নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন কে আছে আমাকে ডাকবে, তাহলে আমি তার ডাকে সাড়া দিব; কে আছে আমার কাছে প্রার্থনা করবে, তবে আমি তাকে দিয়ে দিব, কে আছে আমার কাছে মাগফিরাত কামনা করবে, তবে আমি তাকে মাফ করে দেব। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬৪৫]
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতি রাতে যখন রাতের প্রথম তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হয়ে যায়, তখন আল্লাহ নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন আর তিনি বলতে থাকেন, আমিই বাদশাহ। কে আছে এমন যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব; কে আছে এমন যে আমার কাছে প্রার্থনা করবে, আমি তাকে দিয়ে দেব; কে আছে এমন যে, আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। ফজর উদ্ভাসিত হওয়া পর্যন্ত এ ভাবেই চলতে থাকে। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬৪৬]
আবূ সাঈদ ও আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তাঁরা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ অপেক্ষা করতে থাকেন। অবশেষে রাতের প্রথম তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হয়ে গেলে তিনি নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে বলেন, কেউ কি আছে মাগফিরাতকামী? কেউ কি আছে তাওবাকারী? কেউ কি আছে প্রার্থনাকারী? কেউ কি আছে দুআকারী? এরুপ বলতে থাকেন ফজর উদ্ভাসিত হওয়া পর্যন্ত। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬৫০]
তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ সালাতঃ
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবিতকালে কোন ব্যাক্তি স্বপ্ন দেখলে তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে বর্ণনা করত। এতে আমার মনে আকাঙ্খা জাগলো যে, আমি কোন স্বপ্ন দেখলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বর্ণনা করব। তখন আমি যুবক ছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময়ে মসজিদে ঘুমাতাম। আমি স্বপ্নে দেখলাম, যেন দু’জন ফিরিশতা আমাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে চলেছেন। তা যেন কুপের পাড় বাঁধানোর ন্যায় পাড় বাঁধানে। তাতে দু’টি খুঁটি রয়েছে এবং এর মধ্যে রয়েছে এমন কতক লোক, যাদের আমি চিনতে পারলাম। তখন আমি বলতে লাগলাম, আমি জাহান্নাম থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই। তিনি বলেন, তখন অন্য একজন ফিরিশতা আমাদের সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি আমাকে বললেন, ভয় পেয় না। আমি এ স্বপ্ন (আমার বোন উম্মুল মু’মিনীন) হাফসা (রাঃ) এর কাছে বর্ণনা করলাম। এরপর হাফসা (রাঃ) তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বর্ণনা করলেন। তখন তিনি বললেনঃ আবদুল্লাহ কতই না ভাল লোক! যদি রাত জেগে সে সালাত (নামায/নামাজ) (তাহাজ্জুদ) আদায় করত! এরপর থেকে আবদুল্লাহ (রাঃ) খুব অল্প সময়ই ঘুমাতেন। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৯/তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত, হাদিস নম্বরঃ ১০৫৫]
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তাহাজ্জুদের) এগার রাকা’আত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন এবং তা ছিল তাঁর (স্বাভাবিক) সালাত। সে সালাতে তিনি এক একটি সিজ্দা এত পরিমাণ (দীর্ঘায়িত) করতেন যে, তোমাদের কেউ (সিজ্দা থেকে) তাঁর মাথা তোলার আগে পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করতে পারত। আর ফজরের (ফরয) সালাতের আগে তিনি দু’ রাকা’আত সালাত আদায় করতেন। তারপর তিনি ডান কাঁতে শুইতেন যতক্ষণ না সালাতের জন্য তাঁর কাছে মুয়ায্যিন আসতো। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৯/তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত, হাদিস নম্বরঃ ১০৫৬]
উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যাক্ত তার নিয়মিত ওযীফা বা তার অংশবিশেষ আদায় করতে না পেরে ঘুমিয়ে পড়ল এবং পরে ফজর সালাত ও যুহর সালাতের মধ্যবর্তী সময় তা পড়ে নিল তবে তার জন্য তেমনই লিপিবদ্ধ করা হরে যেন সে তা রাতেই পড়েছে। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬১৮]
আবদুল্লাহ ইবনু উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! রাতের সালাত কি রকম? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, রাতের সালাত দুই দুই (রাক'আত)। যখন তুমি ভোর হয়ে যাওয়ার আশংকা করবে তখন এক রাক’আত দিয়ে বিতর করে নেবে। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬২৩]
উম্মুল মু’মিনীন আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাতে মসজিদে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করছিলেন, কিছু লোক তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করলো। পরবর্তী রাতেও তিনি সালাত আদায় করলেন এবং লোক আরো বেড়ে গেল। এরপর তৃতীয় কিংবা চতুর্থ রাতে লোকজন সমবেত হলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন না। সকাল হলে তিনি বললেনঃ তোমাদের কার্যকলাপ আমি লক্ষ্য করেছি। তোমাদের কাছে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে শুধু এ আশংকাই আমাকে বাধা দিয়েছে যে, তোমাদের উপর তা ফরয হয়ে যাবে। আর ঘটনাটি ছিল রামাযান মাসের (তারাবীহ্র সালাতের)। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৯/তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত, হাদিস নম্বরঃ ১০৬২]
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, একজন জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাতের সালাত (নামায/নামাজ)-এর (আদায়ের) পদ্ধতি কি? তিনি বললেনঃ দু’ রাকা’আত করে। আর ফজর হয়ে যাওয়ার আশংকা করলে এক রাকা’আত মিলিয়ে বিতর আদায় করে নিবে। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৯/তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত, হাদিস নম্বরঃ ১০৭১]
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সালাত (নামায/নামাজ) ছিল তের রাকা’আত অর্থাৎ রাতে। (তাহাজ্জুদ ও বিতরসহ)। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৯/তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত, হাদিস নম্বরঃ ১০৭২]
মাসরূক (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়িশা (রাঃ) কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাতের সালাত (নামায/নামাজ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ফজরের দু’রাকা’আত (সুন্নাত) ব্যতিরেকে সাত বা নয় কিংবা এগার রাকা’আত। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৯/তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত, হাদিস নম্বরঃ ১০৭৩]
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বেলা তের রাকা’আত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করতেন, বিত্র এবং ফজরের দু’ রাকা’আত (সুন্নাত) ও এর অন্তর্ভূক্ত। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৯/তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত, হাদিস নম্বরঃ ১০৭৪]
আসওয়াদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আয়িশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সালাত (নামায/নামাজ) কেমন ছিল? তিনি বললেন, তিনি প্রথমাংশে ঘুমাতেন, শেষাংশে জেগে সালাত আদায় করতেন। এরপর তাঁর শয্যায় ফিরে যেতেন, মুয়ায্যিন আযান দিলে দ্রুত উঠে পড়তেন, তখন তাঁর প্রয়োজন থাকলে গোসল করতেন, অনথায় উযূ (ওজু/অজু/অযু) করে (মসজিদের দিকে) বেরিয়ে যেতেন। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৯/তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত, হাদিস নম্বরঃ ১০৮০]
আবূ সালামা ইবনু আবদুর রাহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি আয়িশা (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেন, রামাযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সালাত (নামায/নামাজ) কেমন ছিল? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে এবং অন্যান্য সময় (রাতের বেলা) এগার রাকা’আতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। তিনি চার রাকা’আত সালাত আদায় করতেন। তুমি সেই সালাতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘত্ব সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। তারপর তিনি তিন রাকা’আত (বিত্র) সালাত আদায় করতেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, (একদিন) আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি বিতরের আগে ঘুমিয়ে থাকেন? তিনি ইরশাদ করলেনঃ আমার চোখ দু’টি ঘুমায়, কিন্তু আমার হৃদয় ঘুমায় না। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৯/তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত, হাদিস নম্বরঃ ১০৮১]
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যাক্তি ঈমান ও নিষ্ঠার সাথে (সাওয়াব প্রাপ্তির বিশ্বাস নিয়ে) রমযানে রাত্রি জাগরণ করে (তারাবী পড়ে), তার পূর্ববর্তী গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬৫২]
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যাক্তি ঈমান ও সাওয়াবের আশায় রমযানের সিয়াম পালন করবে তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। আর যে ব্যাক্তি লায়লাতুল কাদরে ঈমান ও সাওয়াবের আশায় রাত জাগরণ (ইবাদত) করবে তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬৫৪]
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাতে মসজিদে সালাত আদায় করলেন। তখন তাঁর সঙ্গে লোকজন সালাত আদায় করল। এরপর পরবর্তী রাতে তিনি সালাত আদায় করলেন এতে বহু লোক হল। পরে তৃতীয় কিংবা চতুর্থ রাতেও তাঁরা সমবেত হলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের দিকে বের হলেন না। পরে সকালে তিনি বললেন, তোমরা যা করেছ তা তো আমি দেখেছি। তোমাদের কাছে বের হয়ে আসতে আমাকে শুধু এ ই বাধা দিয়েছে যে, আমি আশংকা কছিলাম যে, সে সালাত তোমাদের উপর ফরয হয়ে যেতে পারে। এ ঘটনা রমযানের। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬৫৬]
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধ্য রাতে বেরিয়ে মসজিদে সালাত আদায় করলেন। তখন একদল লোক তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করল এবং সকালে লোকেরা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করল। ফলে তাদের চাইতে অনেক বেশী লোক সমবেত হল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয় রাতে বের হলেন এবং লোকেরা তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করল। এদিন সকালেও লোকেরা বিষয়টি আলোচনা করতে থাকল। এতে রাতে মসজিদের লোক সংখ্যা আরো বেশী হল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে এলেন। লোকেরা তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করল।
চতুর্থ রাতে মসজিদ লোকদের স্থান সংকুলানে অক্ষম হল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের কাছে বের হলেন না। তখন তাদের মাঝে কিছু লোক বলতে লাগল, সালাত! সালাত! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও তাদের কাছে বের হলেন না। অবশেষে ফজরের সালাতের জন্য বের হলেন। ফজরের সালাত আদায় করার পরে লোকদের দিকে মুখ করলেন এবং তাশাহহুদ পাঠের পরে বললেন, আজ রাতে তোমাদের অবস্থা আমার কাছে গোপন থাকে নি। তবে আমার আশংকা হয়েছিল যে, রাতের (তারাবীহ) সালাত তোমাদের উপর ফরয হয়ে যায়; আর তোমরা তা পাননে অক্ষম হও। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬৫৭]
ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝরাতে যখন সালাতের উদ্দেশ্যে উঠতেন তখন (এ দুআ) বলতেনঃ "হে আল্লাহ! আপনারই জন্য যাবর্তীয় প্রশংসা, আপনই আসমান যমীনের নূর (জ্যোতি), আপনারই সকল প্রশংসা, আপনই আসমান যমীনের রক্ষক, আপনারই জন্য সকল প্রশংসা, আপনি আসমান যমীনের মধ্যে যা কিছু রয়েছে সে সবের রব। আপনই সত্য, আপনার ওয়াদা সত্য, আপনার বানী সত্য, আপনার সাক্ষাত সত্য, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, কিয়ামত সত্য। হে আল্লাহ! আপনারই কাছে আত্মসমর্পণ করছি, আপনার প্রতি ঈমান স্থাপন করছি, আপনারই উপর ভরসা করছি, আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করছি, আপনারই প্রদত্ত সত্য প্রমাণ নিয়ে দুশমনের মুকাবিলা করছি, আপনারই কাছে ফয়সালা ন্যস্ত করছি। তাই আমার যা কিছু পুর্বাপর এবং গোপন ও প্রকাশ্য, সে সকল ক্ষমা করুন। মা'বুদ আপনি ব্যতীত আমার কোন ইলাহ নেই। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬৮১]
লায়লাতুল ক্বাদরের দু'আঃ
আইশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন রাতটি লায়লাতুল ক্বাদর, এ কথা যদি আমি জানতে পারি তবে সে রাতে কি দু-আ করব? তিনি বললেন, বলবেঃ
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
হে আল্লাহ! তুমি তো খুবই ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাই তুমি ভালবাস। সুতরাং ক্ষমা করে দাও আমাকে। [সূনান তিরমিজী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৫১/দু’আ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত, হাদিস নম্বরঃ ৩৫১৩, হাদিসের মানঃ সহীহ]
শাহর ইবন হাওশাব (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেনঃ আমি উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা কে বললামঃ হে উম্মুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আপনার কাছে অবস্থান করতেন তখন অধিকাংশ সময় তিনি কি দুয়া করতেন? তিনি বললেনঃ তাঁর অধিকাংশ দু’আ ছিলঃ
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
(উচ্চারণঃ ইয়া মুকাল্লিবাল কুলূব ছাব্বিত কালবী আলা দীনিকা)
অর্থঃ হে অন্তর পরিবর্তনকারি! আমার অন্তর তুমি তোমার দীনে সুদৃঢ় রাখ।
তিনি বলেনঃ আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অধিকাংশ সময় এই দু’আ কেন করেন যে, ইয়া মুকাল্লিবাল কুলূব ছাব্বিত কালবী আলা দীনিকা? তিনি বললেনঃ হে উম্মু সালামা! এমন কোন মানুষ নেই যার অন্তর আল্লহ ত’আলার অঙ্গুলীসমূহের দুই অঙ্গুলের মাঝে নেই। যাকে তিনি ইচ্ছা তাকে তিনি দিনের উপর কায়েম রাখেন, যাকে ইচ্ছা তিনি সরিয়ে দেন। রাবি মুআয (রহঃ) এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেনঃ
ربَّنَا لاَ تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا
হে আমাদের রব্ব! হেদায়তের পর তুমি আমাদের অন্তর বক্র করে দিও না। (আল-ইমরান ৩ঃ 8)। [সূনান তিরমিজী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৫১/দু’আ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত, হাদিস নম্বরঃ ৩৫২২, হাদিসের মানঃ সহীহ]
বিতর সালাতঃ
ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যাক্তি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট রাতের সালাত (নামায/নামাজ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রাতের সালাত দু’দু’(রাকা’আত) করে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ফজর হওয়ার আশংকা করে, সে যেন এক রাকা’আত মিলিয়ে সালাত আদায় করে নেয়। আর সে যে সালাত আদায় করল, তা তার জন্য বিতর হয়ে যাবে। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৪/বিতর সালাত, হাদিস নম্বরঃ ৯৩৭]
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, তার খালা উম্মুল মু’মিনীন মাইমুনা (রাঃ) এর ঘরে রাত কাটান। (তিনি বলেন) আমি বালিশের প্রস্থের দিক দিয়ে শয়ন করলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার পরিবার সেটির দৈঘ্যের দিক দিয়ে শয়ন করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের অর্ধেক বা তার কাছাকাছি সময় পর্যন্ত ঘুমালেন। এরপর তিনি জাগ্রত হলেন এবং চেহারা থেকে ঘুমের আবেশ দূর করেন। পরে তিনি সূরা আলে ইমরানের (শেষ) দশ আয়াত তিলাওয়াত করলেন। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ঝুলন্ত মশকের নিকট গেলন এবং উযূ (ওজু/অজু/অযু) করলেন। এরপর তিনি সালাতে দাঁড়ালেন।
আমিও তার মতই করলাম এবং তার পাশেই দাঁড়ালাম। তিনি তার ডান হাত আমার মাথার উপর রাখলেন এবং আমার কান ধরলেন। এরপর তিনি দু’রাকাত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। এরপর দু’ রাকা'আত, এরপর দু’ রাকা'আত, এরপর দু’ রাকা'আত, এরপর দু’ রাকা'আত, এরপর তিনি বিতর আদায় করলেন। তারপর তিনি শুয়ে পড়লেন। অবশেষে মুয়ায্যিন তার কাছে এলো। তখন তিনি দাঁড়িয়ে দু’ রাকা'আত সালাত আদায় করলেন। তারপর বের হয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৪/বিতর সালাত, হাদিস নম্বরঃ ৯৩৮]
আয়িশা (রাঃ) খেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের সকল অংশে (অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন রাতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে) বিতর আদায় করতেন আর (জীবনের) শেষ দিকে সাহরীরর সময় তিনি বিতর আদায় করতেন। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৪/বিতর সালাত, হাদিস নম্বরঃ ৯৪২]
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) খেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিতরকে তোমাদের রাতের শেষ সালাত (নামায/নামাজ) করবে। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ১৪/বিতর সালাত, হাদিস নম্বরঃ ৯৪৪]
ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক সাহাবী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এমন সময় আসলেন যখন তিনি খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেনঃ রাতের সালাত (নামায/নামাজ) কিভাবে আদায় করতে হয়? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ দু’রাকা’আত দু’রাকা’আত করে আদায় করবে। আর যখন ভোর হওয়ার আশংকা করবে, তখন আরো এক রাকা’আত আদায় করে নিবে। সে সালাত তোমার আগের সালাতকে বিতর করে দিবে। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৮/সালাত, হাদিস নম্বরঃ ৪৫৯]
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তের রাক’আত সালাত আদায় করতেন। এর মধ্যে পাঁচ রাক’আত দিয়ে তিনি বিতর আদায় করতেন এর শেষে ব্যতীত কখনও বসতেন না। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৫৯৩]
আবূ সালামা (রাঃ) বলেন, আমি আয়িশা (রাঃ) এর কাছে গিয়ে বললাম, হে আম্মাজান! আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সালাত সম্পর্কে অবহিত করতন। তিনি বললেন, তাঁর সালাত ছিল রমযান এবং রমযানের বাইরে রাতের রেলায় তের রাক’আত। এর মধ্যে ফজরের দু’রাক’আত (সুন্নাত) ও রয়েছে। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৫৯৯]
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাতের সব অংশেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর আদায় করেছেন রাতের প্রথম অংশে, মাঝরাতে এবং শেষ রাতে। অবশেষ তিনি বিতর আদায় করতেন সাহরীর সময়। [সহীহ মুসলিম (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৬/মুসাফিরের সালাত ও কসর, হাদিস নম্বরঃ ১৬১০]
বিতরের দু'আঃ
আলী ইবন আবূ তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিতর সালাতে পাঠ করতেনঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ وَأَعُوذُ بِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ لاَ أُحْصِي ثَنَاءً عَلَيْكَ أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ
[সূনান তিরমিজী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৫১/দু’আ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত, হাদিস নম্বরঃ ৩৫৬৬, হাদিসের মানঃ সহীহ]
No comments:
Post a Comment